সংসারের খরচ কমানোর ১১ কৌশল – যা আপনার সংসারে উন্নতি আনবে

বর্তমানে আমরা অনেকেই চাই সংসারের খরচটাকে কমিয়ে আনতে। কিন্তু কি করার আয়ের সঙ্গে মানুষের ব্যয়ের সামঞ্জস্যতা নেই বললেই চলে। নিত্যপণ্যসহ সকল কিছু দাম হু হু করে বাড়ার পর বেড়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। এতে করে সংসারের খরচ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া মানুষের নাভিশ্বাস চরমে।

এই অনিশ্চয়তায় সংসারের মাসিক ব্যয় সমন্বয় করতে হবে অন্য কোনো চাহিদার হিসাব বাদ দিয়ে। এরপরও ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে চাহিদায় কাটছাঁট করেও উপায়ান্ত না পেলে জেনে নিতে পারেন নিচের কৌশলগুলো। যদিও সঠিক পরিকল্পনার আর সচেতনতার অভাবে তা আর সম্ভব হয়ে উঠে না। তবে যারা দীর্ঘদিন ধরে সংসারের খরচ কমানোর কথা চিন্তা করছেন কিন্তু পারছেন না তাদের জন্য থাকছে

সংসারে খরচ কমিয়ে আনার উপায় ও কৌশল নিয়ে বেশ কিছু টিপস।

অদরকারি খরচের তালিকা চিহ্নিত করুন

আপনি প্রতিদিন হয়তো প্রয়োজনের চাইতেও বেশি টাকা খরচ করে ফেলছেন। যেমন ধরুন, আমরা ১০০ টাকার কথা উদাহরণ হিসেবে ধরতে পারি। আপনি আপনার প্রতিদিনের খরচের তালিকায় ১০০ টাকার হিসাবটাকে তুচ্ছ ভাবছেন এবং সেই টাকাটা অহেতুক অন্যান্য কাজে ব্যয় করে ফেলছেন এই চিন্তা-ধারায়। তবে কিন্তু আপনার এই ধারণাটুকু ভুল হতে চলেছে। আপনি নিজে প্রতিদিনের এই টাকা ব্যয়ের মাসিক হিসাব করলে দেখবেন তা প্রচুর টাকা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই অপব্যয়ের হাত থেকে এই টাকাটি জমিয়ে রাখতে পারেন। পুরো মাসজুড়ে তা জমাতে শুরু করুন। তারপর মাস শেষে এই হিসাব যোগ করে দেখুন, আপনি অবাক হয়ে যাবেন। যেখানে আপনি ব্যয় করতেন সেই হিসাবটা মাস শেষে কিন্তু বেশ বড়ই হবে। এই বিষয়টি ধারাবাহিক করতে পারলে আপনাকে অনেক খরচ কমাতে সহায়তা করবে। এভাই প্রতিটা অদরকারি খরচের তালিকা চিহ্নিত করুন এবং হিসাবের খাতায় বাড়তি সঞ্চয় যোগ করুন।

বাইরের কফি গ্রহণ ত্যাগ করুন

আপনি হয়তো নিয়মিত বাইরে বন্ধুদের সাথে আড্ডাস্থলে কিংবা একাকি কফি পান করে থাকেন। হিসাবকে আরও কমিয়ে আনতে এই কাজটি ত্যাগ করতে পারেন তাহলে বাহিরে গিয়ে কফি খাওয়ার বাড়তি খরচ আপনার কমে যাবে। তবে কফি খেতে চাইলে প্রয়োজনে বাসায় কফি বানিয়ে নিন তারপর তা একটি ফ্লাস্কে ভরে কর্মস্থলে নিয়ে যেতে পারেন। তাছাড়া আপনি যদি অবশ্যই বাড়তি খরচ এড়াতে চান তাহলে এই অভ্যাসটি গড়ে তোলা খুবই জরুরি। এতে করে আপনার মাসিক খরচ অনেকটা কমবে।

কর্মস্থলে বা কোথাও বেড়াতে গেলে সাইকেলে বা পায়ে হেঁটে চলুন

যদি আপনার কর্মস্থল যদি আপনার বাসা থেকে দূরে না হয় কিংবা বাসার বাহিরের কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে যেতে বের হন তাহলে হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে বা বেড়াতে যেতে পারেন। আর এই অভ্যাসটি আপনার বাড়তি খরচ কমানোর ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী একটি উপায়। আবার সেই সাথে হেঁটে বা সাইকেল চালানোর অভ্যাসটির তারণে আপনার জন্য শারীরিক ব্যায়ামও হয়ে যাবে, এতে করে আপনি ফিট থাকবেন।

ব্যয়বহুল কোল্ড ড্রিংকস ও সফট ড্রিংকস এড়িয়ে চলুন

অনেকেরই ব্যয়বহুল কোল্ড ড্রিংকস ও সফট ড্রিংকস পান করা অনেকটা নিয়মিত অভ্যাস। অথচ এসবের আদৌও কোনো প্রকার উপকার নেই বললেই চলে। সহজ কথায় বলতে গেলে এসব গ্রহণ করাটাও এক ধরনের অপচয়। তাই আপনার বাড়তি খরচ বাঁচাতে এই অভ্যাস এড়াতে হবে। তাহলে এই ব্যয়ের খাত থেকে বেশ কিছু অর্থকড়ির খরচ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আসল কথা হলো, যে জিনিসের কোনো সুবিধা নেই তার পেছনে অহেতুক অর্থ ব্যয়ের কোনো মানেই হয় না।

সংসারের খরচ কমানোর ১১ কৌশল
সংসারের খরচ কমানোর ১১ কৌশল

কয়েন সংগ্রহে রাখুন

প্রতিদিনই আমরা অনেক কাজে অনেক দ্রব্যাদি ক্রয় করে থাকি। কিন্তু এই দ্রব্যাদি বা জিনিসপত্র ক্রয়ের পর দোকানি থেকে অনেক সময় নোটের পাশাপাশি কয়েকটি কয়েনও পেয়ে থাকি। কিন্তু এই কয়েনের হিসাব আমরা রাখি না বললেই চলে। হিসাবের অন্তরালে থাকে বলে এসবের সঠিক ব্যবহার না করায় সেগুলো হারিয়ে যায়। আবার কয়েনগুলো হারিয়ে গেলেও আমরা তার সঠিক হিসাব জানতে পারি না। এজন্য আপনি একটি মাটির ব্যাংক কিংবা কয়েন জমানোর উপযুক্ত মাধ্যম ঠিক করতে পারেন। তারপর সেই ব্যাংকে বা উপযুক্ত জায়গায় কয়েন জমানো শুরু করতে পারেন। অতঃপর মাস শেষে কয়েনের পরিমাণ দেখে আপনি হয়তো অবাক হয়ে যাবেন। কেননা, সেখানে জমানো কয়েনের টাকার অঙ্কটা বেশ বড়ই বলে মনে হবে যা আপনি পূর্বে কল্পনা বা অনুমান করেননি।

ব্র্যান্ডের পণ্য কেনা পরিহার করুন

আমারা অনেকেই সৌখিন জিনিস ক্রয় করে থাকে, আবার তার অনেকটা ভালো মানের কিনতে গিয়ে ব্র্যান্ডের দিকে নজর দেই। ব্র্যান্ডের পণ্যের দাম একদর থাকায় এখানে দামাদামির কোনো সুযোগ থাকে না। তাই বাড়তি টাকা খরচ করে ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে হয়। আবার সৌখিন জিনিস ছাড়াও নানান পোশাক, আসবাবপত্র, ইলেকট্রিক সামগ্রী, খাদ্যপণ্যও আমরা ব্রান্ড থেকে কিনে থাকি। কিন্তু দেখা যায় খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্রান্ডের পণ্য আর সাধারণ পণ্যের স্বাদে-মানে তেমন একটা পার্থক্য থাকে না। আর তাই ব্র্যান্ডিংয়ে প্রলুব্ধ না হয়ে পরিবারের খরচ বাঁচাতে তা কেনা থেকে সরে আসতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনি হয়তোবা ব্রান্ডের জুস কিংবা কোনো প্রক্রিয়াজাত খাবার কিনছেন, অথচ এগুলো চাইলে বাসাতে বানানো যায়। তাই বাড়তি খরচটুকু করার কোনো প্রশ্নই আসে না। এজন্য শুধু শুধু কেনো অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করবেন?

বাইরে নয় বাসার খাবার গ্রহণ করুন

কোনো বিশেষ দিনে, সুখবর বা পদোন্নোতিতে কিংবা কোনো উত্সবের আয়োজনে আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বাহিরে খেতে যাই। আবার কর্মক্ষেত্রে কখনো কখনো বাসায় ফিরতে দেরি হলে আমরা অনেকাংশে বাহিরে ডিনার বা লাঞ্চ সেরে ফেলি। কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে ব্যয়বহুল কোনো রেস্টুরেন্টে মুখরোচক খাবার খেতে যাই। আবার কখনো কখনো বাহিরের খাবার স্বাস্থ্যকর নাও হতে পারে। যদি অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে চিকিত্সার জন্য আরও বাড়তি খরচ যোগ হবে। আচ্ছা, কখনো এমনটা ভেবে দেখেছেন যে এ কারণে প্রতিমাসে আপনাকে অতিরিক্ত কতোগুলো অর্থ ব্যয় করতে হয়। আর তাই বাহিরে খাবার গ্রহণের এই অভ্যাস বাড়তি খরচ হতে পরিত্রাণ পেতে তা এড়িয়ে চলুন। যদি একান্তই কোনো বিশেষ কিছু খাবার খেতে ইচ্ছে হলে চেষ্টা করুন বাসায় রান্না করে খাওয়ার এবং বাসায় পরিবারদের সাথে খাবারের আনন্দও উপভোগ করতে পারবেন বহুগুণে। এতে পরিবারকে যথেষ্ট সময় দেওয়া যায় এবং পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। এতে করে আপনার পকেট খরচ সাশ্রয় হবে, আবার বাহিরের অস্বাস্থ্যকর খাবার না গ্রহণ করার কারণে সুস্বাস্থ্য বজায় থাকবে।

বাড়িতে রান্নায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা

শহরে আমরা অনেকেই বসাবাস করি। আর শহরে বসবাসের বড় সুবিধা এখানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে আমরা প্রয়োজনের তুলনায় এসবের অপব্যবহার একটু বেশি করে ফেলি। যার দরুন মাসিক হিসাবের অনেক অর্থ এখানে ব্যয় করে বসি। অসেকে এসব ব্যবহারে তেমন সচেতন নন। গ্যাস ও বিদ্যুৎ দুটোরই ভয়াবহ অপচয় হয়, যা আপনার মোট ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কেননা, প্রয়োজনের সময় যখন কাজ করবেন তখন ব্যবহার করবেন আর কাজ শেষে তা বন্ধ করে নিবেন। অযথা লাইট, ফ্যান, ফ্রিজ, টেলিভিশন, স্ত্রী, হিটার না ব্যবহার করে সাশ্রয়ী হোন। রান্নার চুলো অয়তা জ্বালিয়ে রাখলে গ্যাস দ্রুত ফুরোয়, সে দিকটাও খেয়াল রাখা উচিত। তাই আমাদের সবারই গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবহারে খুব সচেতন হতে হবে। এতে করে এখান থেকেও সংসারের কিছু ব্যয় কমাতে পারবেন সহজেই।

ঘরের অব্যবহৃত পুরনো জিনিস বিক্রি করুন

আমাদের ঘরে অকার্যর অনেক জিনিস ফেলনা থাকে। কিংবা বাজার থেকে আনা পণ্যের মোড়ক, বোতল, কাগজের বক্স, মার্কেট ব্যাগ বাসায় জমা হয়। কখনো কখনো পরিবারে ব্যবহৃত হয় এমন অনেক জিনিস পুরানো হয়ে যায়, পরবর্তিতে অকেজো জিনিস আর ব্যবহার করা হয় না। আবার সংসারের গৃহস্থালির মধ্যে এমনও অনেক জিনিস আছে যেগুলো আর কাজে লাগে না। এসব অব্যবহৃত জিনিস ঘরের এক কোণে পড়ে থাকে এবং বাড়তি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত থাকে এইসব পুরনো হয়ে যাওয়ায় আবার পুনরায় ব্যবহার করা হয়ে ওঠে না। কিংবা হয়তো এসবের আর দরকার নেই। কিন্তু যে জিনিসটা আপনার জন্য বিশেষত অপ্রয়োজনীয় তা হয়তো অন্য কারও কাছে বেশ প্রয়োজনীয় হতে পারে। তাই পুরনো অব্যবহৃত বা অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সহজে বিক্রি করে দিন। তাহলে সেখান থেকে কিছু টাকা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। এতে করে হাত খরচের কিছু বাড়তি টাকা আয়ের পাশাপাশি সংসারের অন্যান্য কাজে ব্যয় করা যায়। আজকাল পুরনো জিনিস অনলাইন কিংবা অফলাইনে অহরহ বিক্রি হচ্ছে। পুরনো জিনিস কেনাবেচার সহজ উপায় হিসবে আপনি অনলাইন প্লাটফর্ম বেছে নিতে পারেন।

সংসারের খরচ কমানোর কৌশল

পুরনো পোশাক ক্রয় করতে পারেন

বাজারে পুরনো পোশাক কিংবা কাপড়ের মান ভালো তবে মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে সেকেন্ড হ্যান্ড হিসেবে। এসব কাপড় ক্রয় করতে পারেন এতে করে নতুন কাপড় কেনার বাড়তি খরচ থেকে বাঁচা যায়। আজকাল হকার্সে পুরানো কাপড় কম দামে বিক্রি হলেও একটু বাছাই করে কিনলে মানে কিন্তু ভালো পোশাক ক্রয় করা যায়। নতুন পোশাকের দাম চওড়ামূল্যে না কিনে কম খরচে পুরাতন পোশাক কিনলে বাড়তি খরচের দরকার পরে না। এতে করে আরও অর্থ সাশ্রয়ী হয়।

বিলাসবহুল সৌন্দর্যবর্ধক পণ্য কেনা পরিহার করুন

অনেকেই ত্বকের ও চুলের বাড়তি পরিচর্যার জন্য অহেতুক বিলাসি পণ্য কিনে থাকেন এর অনেকটা অনলািনে কেনা হয় থাকে। যার কারণে আরও বাড়তি ব্যয় হতে থাকে। আবার অনেকে এইসব সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যের বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে বাড়তি দামে ক্রিম, সাবান, তেল কিনে থাকেন। কিন্তু, বাস্তবে ত্বকের ও চুলের জন্য প্রয়োজন হলো একটি ভালো ডায়েট। সেই সাথে দরকার খাদ্যাভাসের কিছু পরিবর্তন আর প্রচুর পরিমাণে পানি গ্রহণ ও হাইড্রেশন। আবার বাড়তি এই ব্যয় থেকে পরিত্রাণ পেতে চুলের পরিচর্যায় এসমস্ত ব্যয়বহুল তেল ব্যবহারের পরিবর্তে বাদাম কিংবা নারকেল তেল ব্যবহার করুন। এতে ত্বক ও চুলের পরিচর্যা হয়ে যাবে আবার সংসারের খরচও কমে আসবে।

উপসংহারে এই কথাই না উল্লেখ করলেই নয়, সংসারে খরচ অতিরিক্ত হওয়াটা যেমন দুশ্চিন্তার তেমনে বাড়তি অর্থের যোগানেরও প্রয়োজন পড়ে। তাই আপনার পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয়ের উৎসগুলোকে প্রথমেই চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আপনি একটু খেয়াল করলে তা লিপিবদ্ধ করে হিসাব করে নিতে পারেন। যার ফলে বাড়তি ব্যয়ের দিকটা একটু সচেতন ও বুদ্ধিদীপ্তভাবে কমিয়ে আনাটা আরও সহজতর হবে। খরচের ব্যয়কে লাগাম টেনে ধরলে সাংসারিক অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ ত্বরাণিত হয়। এতে করে মাসিক সঞ্চয়ে ভালো একটি অর্থ যোগ হয় যা কিনা ভবিষ্যতে যে কোনো কাজে ব্যয় করা যায়। পরিবারের সদস্যদেরও অপ্রয়োজনে বাড়তি ব্যয়ে নিরুৎসায়িত করা উচিত, কেননা আপনি একার পক্ষে খরচ পরিচালনা হিসাব মতো করলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের অহেতুক বাড়তি ব্যয় বজায় থাকলে তা আর ফলপ্রসু হয় না। তাই সচেতনতা ও দক্ষতার সাথে এ বিষয়ে কাজ করা যায় পারিবারিক আলোচনা ও রুটিনমতো কাজ পরিচালনার মাধ্যমে।

Leave a Comment